মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে খোলা চিঠি: হাওরের নদীগুলো ইজারামুক্ত করে দিন
গোলাম রসূল | ৫:০৬ অপরাহ্ন, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭

Golam Rosul
শ্রদ্ধেয় প্রিয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি,
সেই ছোটবেলা থেকেই আপনাকে দেখে আসছি। আমাদের গ্রামে, সাভিয়ানগর বাজারে আর অষ্টগ্রাম খেলার মাঠে। কখনো সরাসরি কথা হয়নি আপনার সাথে। আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মনজুরুল হক ভূইয়া আপনি ও বঙ্গবন্ধুর অন্ধ ভক্ত। গোটা উপজেলায় যেকজন নিবেদিত আওয়ামীলীগার আছেন তিনি তার মধ্যে অন্যতম। তিনিই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যিনি সারাজীবন আপনার রাজনীতি করেও আপনার কাছে একটি টাকারও সুবিধা নেননি। চাননি দলীয় কোন পদ পদবি। আপনি তা জানেন। কেন জানিনা তিনি আজ পর্যন্ত আমাদেরকে আপনার কাছে নিয়ে যাননি। পরিচয় করিয়ে দেননি।
কিন্তু অবশেষে আমার সে সৌভাগ্য হল। আপনার সাথে পরিচয় হল অষ্টগ্রামে, জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়। রোটারী ডিগ্রী কলেজের রজতজয়ন্তী ছিল সেদিন। কলেজের অধ্যক্ষ ও আপনার আস্থাভাজন মো: মোজতাবা আরিফ খান স্যার আমাকে আপনার কাছে নিয়ে গেলেন। আলাপ করিয়ে দিলেন। আপনি আব্বার খোঁজখবর নিলেন। অনেক স্মৃতিচারণ করলেন। শেষে আমাকে বলেছিলেন আব্বাকে নিয়ে বঙ্গভবনে যেতে। জোর দিয়েই বলেছিলেন। আর সেটি খেয়াল করেছিলেন অষ্টগ্রাম আওয়ামীলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা নাসিমা আক্তার ম্যাডাম। প্রায় এক ঘন্টা পর আপনার কাছ থেকে যখন ফিরি তিনি আমাকে বলেছিলেন, “হামিদ ভাই এত আন্তরিকভাবে কাউকে বঙ্গভবনে যেতে বলছেন সেটা আমার চোখে পড়েনি। তুমি অনেক ভাগ্যবান। যা চাইবে তাই দিবেন আশা করি।”
আমি আজও একা কিংবা আব্বাকে সাথে নিয়ে বঙ্গভবনে যাইনি। তাই হয়নি আমার কোন চাওয়া পূরণ। কিন্তু আজ আমি চাইছি। হাওর এলাকার সমস্ত নদীগুলোকে আপনি ইজারামুক্ত করে দিন। এটা শুধু আমার চাওয়া না। গোটা হাওর এলাকার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি এটি। আমি বিশ্বাস করি শুধুমাত্র আপনি চাইলেই আমার এ দাবি পূরণ সম্ভব। হাওর এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করে আপনি ইতিমধ্যে লাখো মানুষের অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছেন। পেয়েছেন ভাটির শার্দুল উপাধি। হাওর এলাকার সমস্ত নদীগুলোকে ইজারামুক্ত করে দিলে ভাটি এলাকার মানুষ সারাজীবন আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকবে। আপনার নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। আপনি হবেন হাওর ইতিহাসের মহানায়ক।
আজকে আমার খুব মনে পড়ছে ছোটবেলার কথা। বর্ষাকালে ডোড্ডা বিল ও তার আশপাশে মাছ ধরছে আনোয়ারপুর, মনোহরপুর, রথানী ও পাওন গ্রামের শত শত মানুষ। ছোট ছোট ডিঙি ও কোষা নিয়ে মাছ ধরার সে এক অপরুপ দৃশ্য। হঠাৎ দেখতাম এই নৌকাগুলো তীব্র বেগে আমার পাউন গ্রামের দিকে আসছে। একটু পরেই জানা গেল নদীর ইজারাদারের পাহাড়াদাররা তাদেরকে ধাওয়া করেছে। ধরতে পারলে জাল নিয়ে নিবে। সরকার ইজারা দিয়েছে নদী। অথচ জেলেরা নদী তীরবর্তী বিল ও জমিতেও মাছ ধরতে পারত না। একই দৃশ্য হাওরের প্রত্যেকটি এলাকায় বিরাজমান।
অত্যন্ত দু:খজনক হাওরে মাছ ধরার সে অপরুপ দৃশ্য এখন আর দেখা যায়না। কারণ, শোনা যায় জেলেদেরকে পাহাড়াদারারা এখন আগ্নেয়াস্্র নিয়ে ধাওয়া করে। আগে জীবন, পরে জীবিকা। তাই হাওরে জেলের সংখ্যা কমে গেছে। কমে গেছে ভাটি এলাকার বাজারগুলোতে মাছের পরিমাণ। হাওরের যে মানুষগুলো খাল, বিল আর নদীর তাজা মাছ খেয়ে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে দশকের পর দশক টিকে থেকেছে, সে মানুষগুলো এখন বিদেশী সিলভার কার্প আর পাঙাস মাছের কাছে অসহায়। হাওরের মাছ এখন হাওরের মানুষ খেতে পারে না। খায় টাকাওয়ালা শহুরে মানুষজন। ইজারাদাররা নদীতে মাছের ঘের দিয়ে মাছ ধরে সব মাছ শহরে আর বিদেশে রপ্তানি করছে।
এর ফলে হাওরের অনেক মানুষ বেকার হয়েছে। হাওরের জেলেপাড়ার মানুষরা এখন শহরমুখী। হাওরের মানুষ মাছ কম খেতে খেতে প্রোটিনের অভাবে ভোগছে। মাছে-ভাতে বাঙ্গালি কথাটি এখন আর হাওরের মানুষজন বলতে পারোনা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। আপনি আপনার বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে হাওরের নদীগুলো ইজারামুক্ত করে দিন। তাতে হাওরের নদীগুলোতে মাছ ধরার উৎসব হবে। কমবে বেকারত্বের হার। হাওরের গরীব মানুষগুলো পাবে প্রয়োজনীয় প্রোটিন।
আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। দীর্ঘজীবী হোন।
লেখক: সাংবাদিক, হাওরের সন্তান


6 Comments