বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে মেয়েটি
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ | ১১:২৭ পূর্বাহ্ন, ২৫ অক্টোবর, ২০১৭

কিশোরগঞ্জে ধর্ষিত কলেজছাত্রী বিচারের আশায় আদালত, পুলিশ ও আইনজীবীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রভাবশালী প্রধান শিক্ষকের দাপটের কাছে সবাই যেন অসহায়। কলেজছাত্রী ধর্ষিতা আদৌ সঠিক বিচার পাবে কি-না, এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কারণ যারাই ছাত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে কাজ করতে যান এক সময় তারাই কোনো এক শক্তির প্রভাবে থেমে যান। আদালত থেকে একাধিকবার বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হলেও ঘটনার দুই মাসেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার হননি। তিনি মহা দাপটে স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ওই ছাত্রী জেলার তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা আর সি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। পরে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে গুরুদয়াল সরকারি কলেজে ভর্তি হয়। এ সময় মেয়েটির বাবা-মার মধ্যে বনিবনা না থাকায় মা বিদেশে চলে যান। বাবাও চট্টগ্রামে চলে যান। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে ওই বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মঈনউদ্দিন তাকে খুব স্নেহ করতেন।
প্রধান শিক্ষককে বাবার মতো শ্রদ্ধা করত মেয়েটি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে মাঝেমধ্যে প্রধান শিক্ষক মেয়েটিকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে নানা কায়দায় আদর করতেন। মেয়েটি স্নেহের এবং আদরের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিত।
গত ২০ জুলাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঈনউদ্দিন সাবেরীর জেলা শহরের হারুয়া ফিশারি সড়কে ছাত্রীর মেসে গিয়ে পরদিন তার বাসায় দাওয়াত দেন। ছাত্রীটি দাওয়াত রক্ষা করতে ২১ জুলাই জেলা শহরের চরশোলাকিয়া নীলগঞ্জ সড়কের খানকা শরিফের পশ্চিম পাশে প্রধান শিক্ষকের ভাড়া বাসায় যায়। বাসায় প্রবেশ করার পর দেখতে পায় মঈনউদ্দিন ছাড়া বাসায় আর কেউ নেই। বাসায় কেউ না থাকায় মেয়েটি ভয় পেয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রধান শিক্ষক তাকে ঘরে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। মেয়েটি মেসে ফিরে তার বাবাকে জানালে বাবা চট্টগ্রাম থেকে ছুটে এসে সবাইকে ঘটনাটি জানান ও বিচার চান।
কিন্তু প্রভাবশালী মঈনউদিনের বিচার করতে কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে বাধ্য হয়ে ধর্ষিতা নিজেই বাদী হয়ে গত ২ আগস্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ মামলা গ্রহণ করে। আদালত থেকে আসামিকে গ্রেফতার করার কথা বলা হলেও রহস্যজনক কারণে প্রধান শিক্ষক মঈনউদ্দিন আজও গ্রেফতার হননি।
পরে মেয়েটি পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত ঘটনা জানালে পুলিশ সুপার তাকে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন।
এ অবস্থায় মেয়েটি তার ন্যায়বিচারের ব্যাপারে অনিশ্চয়তার কথা আদালতকে জানালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আওলাদ হোসেন ভূঁইয়া কিশোরগঞ্জ থানার ওসি খোন্দকার শওকত জাহানকে গত ২২ অক্টোবর সিআরপিসির ১৭৩ ধারায় জরুরিভিত্তিতে আগামী ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেন।
এদিকে, বিচারের জন্য মেধাবী ছাত্রী ও আবৃত্তিকার মেয়েটি সংশ্নিষ্ট সবার সঙ্গে দেখা করে কোনো কূলকিনারা না করতে পেরে গত সোমবার ধর্ষণে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে মেয়েটি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ধর্ষণের শিকার মেধাবী মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রভাবশালীরা নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে মেয়েটি সমকালকে জানায়। শিক্ষক মঈনউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। তাকে হেয় করার জন্য মামলা করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ থানার ওসি খোন্দকার শওকত জাহান বলেন, সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা ও তদন্ত করা হচ্ছে। আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সূত্র: সমকাল

