হাওড়ে অকালবন্যার অন্তর্নিহিত কারণ এবং সমাধানের রূপরেখা
মো. খালেকুজ্জামান | ১১:১০ পূর্বাহ্ন, ২৩ জুন, ২০১৮

সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়াঞ্চল ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক বন্যাকবলিত হয়।
সংবাদমতে, হাওড়ের মোট ২১ লাখ হেক্টর এলাকার মধ্যে ৯ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ফসলের চাষ করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদিত বোরো ফসলের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ টন চাল, যার মূল্যমান প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। হাওড় অঞ্চলের ফসল দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ খাদ্যের জোগান দেয় (কালের কণ্ঠ, ৮ জুলাই, ২০১৭)।
সাধারণত বর্ষাকালীন বার্ষিক বন্যা এপ্রিলের শেষ দিক থেকে শুরু হয়, কিন্তু ২০১৭ সালের বন্যা যেহেতু মার্চের শেষ সপ্তাহ ও এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে হাওড়াঞ্চল প্লাবিত করে, তাই বোরো ধান নষ্ট হয়ে যায়। ফসলের ক্ষতি ছাড়াও এ বন্যায় মত্স্য সম্পদ ও গবাদি পশুরও ব্যাপক মড়ক দেখা দেয় (ডেইলি স্টার, এপ্রিল ১৮, ২০১৭)।
সঙ্গত কারণেই যেসব প্রশ্ন মনে উদয় হয় তা হলো, এ রকম অকালবন্যা কি আবারো হওয়ার শঙ্কা আছে এবং মহাবিপর্যয়কারী এ অকালবন্যার অন্তর্নিহিত কারণ কী? এ বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ারই-বা উপায় কী? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এ লেখায় খোঁজা হয়েছে।
প্রথমেই দেখা যাক, কী কী কারণে একটি অঞ্চলে বন্যা হয় এবং কী কী কারণে বন্যার প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। বন্যা সৃষ্টির কারণকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: ১. অববাহিকা অঞ্চলে মোট বৃষ্টিপাতের সময়কাল, পরিমাণ এবং স্থায়িত্বকাল; ২. বৃষ্টি থেকে সৃষ্ট ভূ-উপরিস্থ প্রবাহ (surface run-off) নদীনালা-খালবিলের ধারণক্ষমতা হ্রাস; এবং ৩. সমুদ্রের তুলনায় ভূমি অঞ্চলের উচ্চতা হ্রাস।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটের কিছু অঞ্চলের অববাহিকার উজানের অংশের বেশির ভাগই ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত। তাই উজানের গারো, খাসিয়া ও জৈয়ন্তিয়া পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে যখন বৃষ্টিপাত হয়, তখন তার অনেকটাই ভূ-উপরিস্থ প্রবাহের আকারে ভাটিতে অবস্থিত হাওড়ের বিভিন্ন নদীনালা, খালবিলে এসে জমা হয়। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চলখ্যাত চেরাপুঞ্জি সুনামগঞ্জের উজানে মেঘালয়ে অবস্থিত। ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ থেকে এপ্রিলের ৪ তারিখ সময়কালে চেরাপুঞ্জিতে ১ হাজার ২৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা কিনা ২০১৬ সালের একই সময়কালের চেয়ে ৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
তাছাড়া এ বৃষ্টিপাত হয় এক নাগাড়ে, অর্থাৎ প্রতিদিনের বৃষ্টির পানি খালবিল-নদীনালা দিয়ে ভাটিতে সরে যাওয়ার কোনো সময়ই পায়নি। উল্লেখ্য, চেরাপুঞ্জির দৈনিক বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ইন্টারনেট থেকে সহজেই পাওয়া গেলেও হাওড় অববাহিকার অন্যান্য অঞ্চল যেমন— গারো, খাসিয়া, জৈয়ন্তিয়া পাহাড়, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের গড় মাসিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জানা থাকলেও দৈনিক বৃষ্টিপাতের রেকর্ড দুর্লভ।
বন্যার অন্তর্নিহিত কারণ জানার জন্য বন্যার অব্যবহিত আগের এবং বন্যার সময় প্রতি ঘণ্টার এবং দৈনিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জানা খুবই জরুরি। গারো, খাসিয়া, জৈয়ন্তিয়া পাহাড় এবং সুনামগঞ্জের গত ১০০ বছরের মাসিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণের সঙ্গে চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিপাতের একটি যুগসূত্র দেখা যায়। এ যুগসূত্র ব্যবহার করেই এ লেখক বন্যার সময় অববাহিকার অন্যান্য অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৭ সালে বন্যার সময় চেরাপুঞ্জিতে যখন ১ হাজার ২৬২ মিলিমিটার (প্রায় ৫০ ইঞ্চি) বৃষ্টি হয়, তখন সুনামগঞ্জে ৩৫০ মিলিমিটার এবং গারো পাহাড়ে মাত্র ২০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। উজানের একেক অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ভাটিতে হাওড়ের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খাসিয়া পাহাড়ে অবস্থিত চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিপাত ভাটিতে অবস্থিত ওঁয়া উমগি নদী কিংবা পিয়াইন নদীর অববাহিকায় বন্যার সৃষ্টি করলেও ছাতকের যাদুকাটা নদীর অববাহিকায় সামান্যই প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা রক্তি নদীর প্রবাহ ভাটিতে অবস্থিত তাহিরপুর অঞ্চলে ব্যাপক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বন্যার কারণ খুঁজতে হলে অববাহিকাভিত্তিক নদীর ধারণক্ষমতা এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন সমীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা জরুরি। এ গবেষণা থেকে আরো একটি জিনিস বেরিয়ে এসেছে। আর তা হলো, সাম্প্রতিককালে এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, সময়কাল এবং ধরনে একটি ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯০১ থেকে ১৯৫৮— এ সময়কালে চেরাপুঞ্জিতে মে মাসের তুলনায় এপ্রিলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম ছিল এবং প্রতি তিন-চার বছর অন্তর বেশি বৃষ্টিপাত হতো; অন্যদিকে ১৯৫৯ থেকে ২০১৭ সময়কালে বৃষ্টিপাতের ধরনে একটি আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আর তা হলো, এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টিপাতের পরিমাণের মধ্যকার ফারাক অনেক কমে এসেছে এবং মে মাসের তুলনায় এপ্রিলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গত কয়েক দশকে বেড়েছে। একই প্রবণতা পশ্চিম খাসিয়া পাহাড়েও লক্ষ করা যায়। এ পরিবর্তন হাওড় অঞ্চলে ভবিষ্যতেও বোরো মৌসুমে আগাম বন্যার প্রবণতা বাড়াবে বলেই ধারণা করা যায়।
এখন আসা যাক হাওড়ের নদীনালা-খালবিলের বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা প্রসঙ্গে। ২০১৭ সালে বন্যার সময় (২৮ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) হাওড় অঞ্চলের উজানের গারো-খাসিয়া-জৈয়ন্তিয়া পাহাড় অঞ্চলের পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে শূন্য দশমিক ৫৪ মিটার বৃষ্টিপাতের ফলে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানির উত্পত্তি হয়, যার প্রায় সবটাই ভাটিতে হাওড় অঞ্চলের নদীনালা-খালবিলে প্রবাহিত হয়েছে। তাছাড়া ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারব্যাপী হাওড় অঞ্চলেও একই সময়ে শূন্য দশমিক ৩৭ মিটার বৃষ্টিপাতের ফলে অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি জমা হয়েছে। আটদিনে সাকল্যে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানির উত্পত্তি হয়েছিল, যা কিনা হাওড়ের নিম্নাঞ্চলে ৬ দশমিক ৪ মিটার গভীর বন্যা সৃষ্টি করতে সক্ষম। কিন্তু পুরো আটদিন যেহেতু সব পানি হাওড়ে স্থবির হয়ে থাকেনি, এর কিছু নদীপথে ভাটিতে সরে গেছে, তাই বন্যার গভীরতা কম ছিল। বন্যার পানি ভাটিতে অবস্থিত বড় নদী, অর্থাৎ ভৈরবে অবস্থিত মেঘনা নদীতে প্রবাহিত হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন কারণে হাওড়ের নদীনালা-খালবিলগুলোর পানি ধারণক্ষমতা অনেক হ্রাস পেয়েছে। তাই বন্যার প্রকোপ প্রয়োজনের তুলনায় আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। উজান থেকে বয়ে আসা পলি নদীবক্ষে স্তরায়ন, অপরিকল্পিতভাবে হাওড় অঞ্চলে রাস্তাঘাট নির্মাণ, অববাহিকা অঞ্চলে বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস, ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন, অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলন, নগরায়ণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধ নির্মাণের ফলে বন্যাপ্রবাহ ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। উজানের ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাড়তি পানি ও পলি প্রবাহের অনেকটাই ভাটিতে এসে বন্যার প্রকোপ বাড়াচ্ছে। মেঘালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বন ও পাহাড় ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের খনিজ প্রকল্পের কারণে পলির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য, সীমান্ত অতিক্রম করার অব্যবহিত পরেই যাদুকাটা নদীর প্রশস্ততা ২০০৪ সালে যেখানে ১৬৮ মিটার ছিল, তা ২০১৭ সালে মাত্র ৬৮ মিটারে পরিণত হয়েছে। পিয়াইন, রক্তি, সারি নদীর অবস্থাও একই। হাওড়ের নদীগুলো সাধারণত উত্তর থেকে দক্ষিণে অথবা পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। কিন্তু হাওড় অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট হাওড়ের ওপর দিয়ে বিভিন্ন দিকে চলে যাওয়ায়ও ভূ-উপরিস্থ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে বন্যার পানি গড়িয়ে নদীতে পড়তে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হয়। হাওড়ের নদীনালা-খালের ওপর যে কালভার্ট তৈরি করা হয়, সেগুলো নিচে বয়ে যাওয়া পানিপ্রবাহ ধারণক্ষমতার তুলনায় অপ্রতুল অথবা নদীনালা ভরাট হয়ে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণেও বন্যা দীর্ঘায়িত হয়। ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন আনার কারণেও প্রবাহ ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। যেমন— বনাঞ্চল কিংবা জলাভূমি পরিবর্তন করে যখন বাড়িঘর তৈরি করা হয়, তখন বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ না করে সরাসরি পাশের খালবিল-নদীনালায় গড়িয়ে বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হাওড়ের অববাহিকার অনেক ভূমি ব্যবহারেই এমন পরিবর্তন এসেছে, যা কিনা বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। অপরিকল্পিতভাবে পাথর ও বালি উত্তোলনের ফলেও হাওড়ের অনেক নদীর নাব্যতা এবং ধারণক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সিলেটের বিছানাকান্দির পিয়াইন নদীসহ সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ঐতিহাসিক মানচিত্র এবং আকাশ ছবি দেখলেই এর সত্যতা মিলবে। ভূগাঠনিক ও প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী প্রতিটি নদীর পানি ধারণক্ষমতা উজানের তুলনায় ভাটিতে বেশি হয়। কারণ একটি নদী যত ভাটির দিকে ধাবিত হয়, তত বেশি ভূগর্ভস্থ পানি নদীর তলদেশে চুইয়ে চুইয়ে যোগ হয়।
তাছাড়া আরো শাখা নদী এসে যোগ হয়। তাই বাড়তি পানির জোগানকে ধারণ করার জন্যই সব নদী উজানের তুলনায় ভাটিতে প্রশস্ত ও গভীর হয়, হাওড়ের নদীগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রক্তি, ওঁয়া উমগি, পিয়াইন, যাদুকাটা ও মেঘনা নদীর প্রস্থ উজানের তুলনায় ভাটিতে কম। ফলে বন্যার সময় হাওড়ের প্রায় সব কয়টি নদী দুকূল চাপিয়ে আশপাশের অঞ্চল প্লাবিত করে। ভৈরবের রেল সেতুর নিচে অবস্থিত মেঘনা নদী হচ্ছে হাওড় অঞ্চলের সর্বশেষ নিষ্কাশন অঞ্চল। এখানে নদীর ওপর রেল সেতু ও সড়ক সেতু নির্মাণের ফলে মেঘনা নদীর প্রস্থ দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ নিষ্কাশন অঞ্চলের কয়েক কিলোমিটার উজানে অর্থাৎ ভৈরবের কালীপুর এলাকায় মেঘনা নদীর প্রস্থ যেখানে ১ হাজার ৬৫৬ মিটার, সেখানে ভাটিতে রেল সেতুর নিচে এ নদীর প্রস্থ হচ্ছে মাত্র ৬৭১ মিটার। তাছাড়া তিনটি সেতুর পিলারের কারণে নদীর প্রস্থ ও প্রস্থচ্ছেদ আরো কমে গেছে। এখানে নদীর এ ‘গলাচিপা’ অবস্থার কারণে রেল সেতুর নিচে বন্যার পানি যেহেতু বিনা বাধায় নিষ্কাশিত হয়ে ভাটির সমুদ্রে গিয়ে পড়তে পারে না, তাই উজানে অবস্থিত সব ভাটি অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং বন্যা প্রলম্বিত হয়।
অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে যেহেতু সমুদ্রপৃষ্ঠ উপরে উঠে আসছে, তাই হাওড়ের নদীগুলোর বন্যার পানি সমুদ্রে নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এছাড়া পুরো হাওড় অঞ্চল ভূতাত্ত্বিক কারণে ধীরে ধীরে নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রের তুলনায় ভূমি উচ্চতাও কমছে এবং বন্যায় বেশি প্লাবিত হচ্ছে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? প্রথমত. সমস্যার কারণ নির্ধারণ করাতেই অর্ধেক সমাধান নিহিত থাকে। উল্লিখিত কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিম্নোক্ত সুপারিশমালা এবং সমাধানের রূপরেখা প্রদান করা হলো— ১. হাওড়ের প্রতিটি নদী, খাল, জলাশয়ের গভীরতায় পরিবর্তনের ধরন নির্ধারণকল্পে কয়েক বছর অন্তর অন্তর ভূমিরূপ, ভূমি ব্যবহার ও উচ্চতার জরিপ চালানো জরুরি; ২. ভৈরবের উজান থেকে মেঘনা নদীর পানিপ্রবাহ বিকল্প খাল বা চ্যানেল কেটে ভৈরব ব্রিজের ভাটিতে ছেড়ে দেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি; ৩. পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মিল রেখে সঠিক বোরো ধানের জাত ও রোপণের সময়কাল নিয়ে আরো বেশি গবেষণা হওয়া জরুরি এবং সে মোতাবেক কার্যকর ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন; ৪. বন্যা থেকে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ধরন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সময়কালও পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ীই করতে হবে; ৫. যেহেতু নদীগুলোর প্রবাহ ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, তাই বন্যার প্রকোপ কমাতে হলে নদীগুলোর পানি বহন ক্ষমতাও আনুপাতিক হারে নিয়মিত বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে; ৬. ভৈরব ব্রিজের নিচে মেঘনা নদীর প্রস্থচ্ছেদের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, যে কারণে উজানের হাওড়ের বন্যার পানি কার্যকরভাবে দ্রুততার সঙ্গে নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বন্যার স্থায়িত্বকাল দীর্ঘায়িত হয় বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে এ বিষয়টি সমীক্ষা করা জরুরি; ৭. যেহেতু হাওড়ের নদীগুলোর বেশির ভাগই দেশের সীমানার বাইরে থেকে উৎসারিত হয়েছে। তাই সব যৌথ নদীর পানি ও পলি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ব্যতিরেকে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না; ৮. যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো নতুন সংস্থার মাধ্যমে ভারতের ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের সঙ্গে মেঘনা অববাহিকার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিশন গঠন করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি; ৯. প্রস্তাবিত এ কমিশনের মাধ্যমে শুধু যৌথ নদীর পানি বণ্টন নয়; বরং অববাহিকার পানি-পলি-ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সব কার্যক্রম সংগঠিত হবে, যাতে করে সব অংশীদারের স্বার্থ সমানভাবে রক্ষিত হবে। এবং (১০) জাতিসংঘের পানিপ্রবাহ আইন (১৯৯৭)-এর আওতায় পানি-পলি-নদী-ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেয়া বাংলাদেশের জন্য জরুরি।
লেখক: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, লক হ্যাভেন ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

