শেষ হল ডা. রমেন্দ্র নারায়ণ সরকার স্মৃতি উৎসব
বিশেষ প্রতিনিধি | ৮:৩৯ অপরাহ্ন, ১৭ মার্চ, ২০১৮

শেষ হল কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়ায় ডা. রমেন্দ্র নারায়ণ সরকার স্মৃতি উৎসব-২০১৮।
আজ শনিবার উৎসবের দ্বিতীয় ও শেষ দিনের কর্মসূচীর মধ্যে ছিল-সকাল ৯টা-দুপুর ২টা: চারুশিল্পীদের তত্ত্বাবধানে চিত্রাঙ্কন, দুপুর ৩টা: কর্মশালায় অঙ্কিত ছবির প্রদর্শনী, স্থান: চৌদ্দমাদল প্রাঙ্গণ। বিকেল ৪টা: সনদ বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠান।
এর আগে শুক্রবার (১৬ মার্চ) উৎসবের প্রথম দিন শেষ হয়। ‘স্বরণে সৃষ্টির উৎসব’ শিরোনামের দুইদিন ব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
উৎসবের প্রথম দিনের কর্মসূচীর মধ্যে ছিল-সকাল ৯ টা: বাঙ্গালপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিশুদের উপস্থিতি, সকাল ৯টা ৩০ মিনিট: বাঙ্গালপাড়া লঞ্চঘাট থেকে শোভাযাত্রা, সকাল ১০টা: কর্মশালার উদ্বোধন, সকাল ১১টা-দুপুর ৩টা: চারুশিল্পীদের তত্ত্বাবধানে চিত্রাঙ্কন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অষ্টগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম জেমস, নারীনেত্রী সৈয়দা নাসিমা আক্তারসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
ডা. রমেন্দ্র নারায়ণ সরকারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ উৎসবের আহবায়ক অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ও সদস্য সচিব মুহাম্মদ রুবেল। কর্মশালার সমন্বয়ক শিল্পী মাসুদুর রহমান।
বাঙ্গালপাড়া গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. রমেন্দ্র নারায়ণ সরকার ১৯৫২ সালে অষ্টগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পাশ করার পরপরই কর্ম জীবনের শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি করমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা পেশায় দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর নজরে আসেন বাঙ্গালপাড়ার আরেক কৃতি সন্তান রমেন্দ্র নারায়ণের বাবার বন্ধু, বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম সার্জন ডা. রেফাত উল্লাহর।
ডা. রেফাত উল্লাহর হাত ধরে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। সেখানে তিনি মিডফোর্ট স্কুল থেকে ফার্মাসিস্ট পেশায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এর পরপরই তাঁর চাকুরী হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। পোস্টিং হয় খুলনায়। সেখানে কিছু দিন চাকুরী করার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে ফার্মাসিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। চাকুরী জীবনে তিনি বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং পেয়েছেন। যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই ভাল মানুষের স্বীকৃতি জমা করেছেন নিজের জুলিতে।
তাঁর জীবনের উল্লেখ্যযোগ্য কর্মস্থলগুলোর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির কথা না বললেই নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কটিয়াদি উপজেলা স্বাস্থ্য ক্লিনিকে কর্তব্যরত ফার্মাসিস্ট। যুদ্ধের করুণ পরিস্থিতির সময় সবাই যার যার মত করে চলে গেলেও নিজ দায়িত্ববোধ থেকে তিনি সেখানে থাকেন। তারপর ঐ স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই গড়ে তুলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার অবয়াশ্রম। কিন্তু রাজাকারদের তৎপরতায় তাঁর সে কার্যক্রমের জন্য অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তারপরও অধম্য দেশপ্রেমিক এই মানুষটি চালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে তার কর্তব্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোগীর বেশে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাকেও। অবসর প্রাপ্তির ১২ বছর পূর্বেই ১৯৮২ সালের দিকে কর্মজীবনকে বিদায় জানিয়ে স্বপরিবারে চলে আসেন নিজ গ্রামে।
শিশুকাল থেকেই জন্মভূমির প্রতি ছিল তাঁর অন্যরকম ভালোবাসা। হিন্দু-মুসলিম সবার সাথেই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। গ্রামের সহজ-সরল গরিব মানুষের অঘোষিত ডাক্তার হিসেবে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন বছরের পর বছর। বৃক্ষের প্রতি ছিল তাঁর অঘাত ভালোবাসা। কর্মস্থলে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত অনেক বৃক্ষ রয়েছে। গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে গড়ে তুলেছেন বনায়ন। এসব গুণাবলির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল পিতাও। তিনি চার ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তারা সবাই উচ্চ শিক্ষিত ও স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
তাঁর ছেলে ও মেয়ে: তপন সরকার (শিক্ষক), তাপস সরকার (অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা), তরুণ সরকার (প্রাথমিক জীবনে সাংবাদিক, বর্তমানে গবেষক), তুষার সরকার (উপ-সহকারি পরিচালক, র্যাব-১০), অপর্ণা সরকার (গৃহিণী)।
২০১৭ সালের ২৭ মার্চ এ সমাজহিতেষী পরলোকগমন করেন।

