কিশোরগঞ্জের ৩৩১ জলমহাল প্রভাবশালীদের দখলে
নিউজ ডেস্ক | ৪:৩৮ অপরাহ্ন, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

নিউজ ডেস্ক: কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলসহ জেলার জলমহালগুলো প্রভাবশালীদের দখলে। মৎস্য সমবায় সমিতির ব্যানারে তারা জলমহালগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে জেলেদের মাছ ধরার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এমনকি উন্মুক্ত জলাশয় এবং ভাসান পানিতেও প্রকৃত জেলেরা মাছ ধরতে পারছেন না। ফলে প্রকৃত জেলে সম্প্রদায় তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, জেলে সম্প্রদায়ের সদস্যরা পেটের দায়ে ভাসান পানিতে মাছ আহরণ করতে গেলে এলাকার চিহ্নিত প্রভাবশালীদের গুন্ডা বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত জেলেরা উন্মুক্ত জলমহালে অবাধে মাছ ধরতে না পারায় বর্তমানে জেলে পরিবারের শত শত সদস্য দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। অনেকেই পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের হাওরে ২০ একরের ঊর্ধ্বে ১৭৯টি ও ২০ একরের নিচে ১৫২টি জলমহাল রয়েছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে সরকারি নিয়মনীতি মেনে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে দরপত্র আহ্বান করে ২০ একরের বেশি জলমহালগুলো ৩ ও ৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ২০ একরের কম জলমহালগুলো উপজেলা পরিষদ থেকে ইজারা দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নেপথ্যে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাবশালী চক্র। কারণ অধিকাংশ জলমহাল ইজারা নিতে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ওইসব ইজারাপ্রাপ্ত জলমহালের সঙ্গে জড়িতরা অতি দরিদ্র জেলে। তাই তারা পরে বাধ্য হয়ে সম্পদশালী ওইসব মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাবশালীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জলমহালগুলো পরিচালনা করে থাকে। শর্ত থাকে জলমহালের আহরিত মাছের সিংহভাগ তারা নিয়ে যাবে। শর্ত অনুযায়ী টাকা দিয়ে প্রকৃত জেলে সম্প্রদায় 'জাল যার জলা তার নীতি'র আড়ালে নিঃস্ব হয়ে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। সরেজমিন গিয়ে নিকলী উপজেলার ছাতিরচরের জেলে ছোরাত আলী, মেরাজ মিয়া, ইব্রাহীমসহ ৫০ জন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলমহাল ও নদীর ভাসান অংশও বর্তমানে ইজারাদাররা নিজেদের দাবি করে ভাসান পানিতে মাছ ধরতে দিচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, ভাসান পানিতে মাছ আহরণ করতে গেলে ওইসব মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা মারধর, জাল-নৌকা লুট, মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ফলে ভয়ে তারা নদীতে ও ভাসান পানিতে যেতে সাহস করেন না। কোনো কোনো ইজারাদার ২০ একর ইজারা নিয়ে ৫০ একর দখল করে আসছেন। জেলা রাজস্ব বিভাগসহ মৎস্য নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক সংস্থা জানায়, জেলার ২০ একরের বেশি জলমহালগুলো থেকে ইজারা বাবদ ১২ কোটি ও ছোট জলমহাল থেকে ৩ কোটি করে মোট ১৫ কোটি টাকা সরকার রাজস্ব হিসেবে পেয়ে থাকে। কিন্তু সারা জেলায় উৎপাদিত এবং আহরিত মাছের পরিমাণ হচ্ছে ৭২ হাজার ৯৬০ টন। যার প্রায় ৬০ ভাগ হাওরের জলমহাল থেকে আহরিত। এসব মাছের মূল্য প্রতি টন গড়ে ৫ লাখ টাকা হলে মোট ৩৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার মাছ উৎপাদিত হয়। এ হিসাব অনুয়ায়ী ২১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকার মাছ জলমহাল থেকে আসে। মাত্র ১২ কোটি টাকা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ওইসব প্রভাবশালী জলমহালগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা প্রতি বছর প্রায় ২১৯ কোটি টাকার মাছের ব্যবসা করছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বীকার করেন, তারা প্রকৃত জেলেদের ইজারা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইজারা পাওয়ার পর দেখা যায়, প্রাপ্ত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে কোনো অর্থশালী কিংবা প্রভাবশালী টাকা দিয়ে জলমহাল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে। 'হাওরের পাশে বাংলাদেশ' এর সদস্য সচিব হাসনাত কাইয়ূম সমকালকে জানান, আমাদের দুর্ভাগ্য মাত্র ১০০ প্রভাবশালী জলমহালগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই জলমহালের ইজারা প্রথা বাতিল করা সময়ের দাবি। প্রকৃত জেলেদের ফি বাবদ নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নিয়ে সরকারিভাবে পরিচয়পত্র দেওয়া হলে ইজারার টাকার চেয়ে বেশি রাজস্ব পাবে সরকার। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান, সরকারি আইন ও নিয়ম মেনে প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ভাসান পানিতে বা উম্মুক্ত জলাশয়ে জেলেদের অবাধ অধিকার সরকারিভাবে রয়েছে। মাছ ধরতে প্রভাবশালীদের বাধার সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র: সমকাল

