চীনকে ঠেকাতে ভারতের সঙ্গে জোট আমেরিকার
নিউজ ডেস্ক | ৯:০৪ পূর্বাহ্ন, ১৪ নভেম্বর, ২০১৭

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তথা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে আচমকাই বড়সড় পরিবর্তন হতে চলেছে। চীনের মোকাবিলায় ইন্দো-প্যাসিফিক সেক্টরজুড়ে বিশ্বের চারটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিশেষ জোট গঠিত হয়েছে। যার প্রধান দুই সদস্য ভারত ও আমেরিকা। পাশে রয়েছে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াও।
গতকাল ম্যানিলায় আসিয়ান গোষ্ঠীর সম্মেলন এবং ইস্ট এশিয়া সম্মেলনের ফাঁকে সম্পূর্ণভাবে পৃথকভাবে এই জোটের কাঠামো গড়ে তুলেছে। প্রথম বৈঠক হয়েছে গতকাল। আজ থেকে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে পৃথক একান্ত বৈঠক। আজ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে আমেরিকার একঝাঁক জটিলতার অবসান হয়েছে। ভারত আমেরিকার স্বাভাবিক মিত্র।
মোদিও বলেছেন, নিছক বাণিজ্য বা সামরিক সহযোগিতায় আটকে থাকবে না ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক। আরও এগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি, সন্ত্রাসবাদ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভারত ও মার্কিন বন্ধুত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
আগামীকাল জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একইভাবে বৈঠকে বসবেন মোদি। এবং তারপর আবার চার রাষ্ট্রপ্রধান একজোট হয়ে বৈঠক করনে কিনা সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। এই অক্ষ গঠনের প্রধান অ্যাজেন্ডা হিসাবে বলা হচ্ছে সামুদ্রিক পথের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, নৌ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গড়ে তোলা, সমুদ্ররুটে বাণিজ্য, সামরিক, অসামরিক তাবৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই চারটি রাষ্ট্র চুক্তিবদ্ধ হবে। মুখে একবারও নাম বলা না হলেও আদতে এই অক্ষ চতুষ্টয় চীনকেই চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া।
কারণ দক্ষিণ চীন সমুদ্র তো আছেই, ভারত মহাসাগরীয় এলাকাতেও চীন সামরিক ও অসামরিক পরিকাঠামোক্রমাগত আগ্রাসীভাবে বাড়িয়ে চলেছে। এর আগে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে চীন নিজের একচ্ছত্র অধিকার কায়েমের লক্ষ্যে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলির উপকুলবর্তী এলাকায় সামরিক কাঠামো গঠন করেছিল। সেই নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয় ওই দেশগুলি। আদালত স্পষ্ট জানায় সমুদ্রপথ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন রাখতে হবে। কোনও বিশেষ রাষ্ট্র কোনও কোনও সমুদ্রকে সম্পূর্ণ ব্লক করে দিতে পারবে না।
কিন্তু চীন এই রায় সেভাবে গ্রাহ্য করেনি। তারপর বরং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরেও চীনের সামরিক ও অসামরিক পরিকাঠামো ও বিভিন্ন সমুদ্রতীরবর্তী দেশকে আর্থিক ও পরিকাঠামোগত সহায়তাব নামে সেখানে স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি নির্মাণ করে চলেছে চীন। আফ্রিকার একের পর দেশকে পুনর্নির্মাণের প্যাকেজ দেওয়ার অজুহাতে চীন সেখানে নিজেদের ঘাঁটি গঠন করেছে। আর ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে তুলছে একের পর এক বন্দর কাঠামো। চট্টগ্রাম থেকে শ্রীলংকা। সর্বত্রই চীনের পদধ্বনি।
ঠিক এরকমই একটি আবহে ম্যানিলায় ইস্ট ওয়েস্ট এশিয়ার সম্মেলনের প্রাক্কালে আচমকা আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার একজোট হওয়া কূটনৈতিক সমীকরণে সম্পূর্ণ নতুন এক পদক্ষেপ। কারণ ভারতকে বহুদিন ধরেই বাকি তিন দেশ বিশেষ করে আমেরিকা এরকম একটি জোটে আসার কথা বলেছে। কিন্তু এতদিন ভারত ভারসাম্যের কূটনীতি করতে চেয়েছে। যাতে শুধু চীন নয়, একবার আমেরিকা, জাপান আর অস্ট্রেলিয়ার জোটে চলে গেলে রাশিয়াও অসন্তুষ্ট হতে পারে। অবশেষে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদি।
বস্তুত চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের দুই প্রধান বিরোধী রাষ্ট্র হল জাপান ও ভারত। জাপান চাইছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রবলভাবে তাদের বাণিজ্যিক ও স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি বাড়াতে। আর তার জন্য ভারতকে পাশে পাওয়া দরকার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রথম থেকেই চাইছিলেন এরকম একটি চার দেশের জোট গড়ে উঠুক। আজ থেকে নয়। ২০০৭ সাল থেকে শিনজো আবে এই প্রয়াসে উদ্যোগী ছিলেন।
গত মাসেই ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন ভারতকে বলেছিলেন, এখনও ভারত যদি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি কবে তাহলে দেরি হয়ে যাবে। তারপরই ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই জোটে অংশ নেওয়া হবে। বোঝাই যাচ্ছে আগামীদিনে নৌ ও সমুদ্র আধিপত্যই হতে চলেছে বিশ্বের পাওয়ার করিডরের ভরকেন্দ্র। আর সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেই ভারত ও আমেরিকা এখন জাপান –অস্ট্রেলিয়াকে পাশে নিয়ে গড়ে তুলছে নয়া জোট।
সূত্র: বর্তমান, কলকাতা

