করোনা মোকাবেলায় প্রশংসিত দোহারের ইউএনও অষ্টগ্রামের আফরোজা
গোলাম রসূল | ১১:১৮ পূর্বাহ্ন, ১৫ এপ্রিল, ২০২০

ইউএনও আফরোজা আক্তার রিবা
করোনা মোকাবেলায় দিনরাত পরিশ্রম করে প্রশংসিত হচ্ছেন ঢাকা জেলার দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কলিমপুর গ্রামের আফরোজা আক্তার রিবা।
করোনা ভাইরাসের সংক্রামণের ঝুকিতে যেখানে ডাক্তাররা সেবা প্রদানে অনিচ্ছা প্রকাশ করে মৃত্যু ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন এই সাহসী নারী। করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ যখন মহামারীতে রুপ নেয় তখনি তিনি তার নিজ উদ্যোগে দোহার উপজেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ সতর্কতা বিষয়ক আলোচনা ও জনসাধারণকে সতর্ক করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঘরে শিশু সন্তানদের রেখে তিনি প্রতিদিন করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ রোধে জনসাধারনকে ঘরে রাখতে নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। নিজ মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে দোহার উপজেলা বাসীদের সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতার জন্য তিনি নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দোহারের জনসাধারনকে করোনা ভাইরাসের মহামারী থেকে রক্ষা করতে এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে খাদ্য বিতরণে তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূয়সী ভূমিকা পালন করছেন।

আফরোজার স্বামী মো. আকতারুজ্জামান ভূঁইয়া হাইকোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (যুগ্ম জেলা জজ) হিসেবে কর্মরত এবং ভাসুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনীতি বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি দেশের মিডিয়া অঙ্গণে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তাঁর লেখনির মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এ শিক্ষাবীদের সহধর্মীণী ড. মুনিরা সুলতানা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।
আফরোজার শ্বশুর প্রয়াত মো. মাইন উদ্দিন ভূঁইয়া ছিলেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উর্দ্বতন কর্মকর্তা এবং আদমপুর দেওয়ান আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। তাঁর ঔরসজাত আট সন্তান নিজেদের কর্ম ও গুণের মাধ্যমে আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও আলো ছড়াচ্ছেন। আলোকিত করেছেন আব্দুল্লাহপুর-কলিমপুরসহ গোটা হাওরাঞ্চলকে।এবং শ্বাশুরি রওশন আরা বেগম রত্নগর্ভা মা হিসেবে এ বছর জয়িতা পুরস্কার লাভ করেন।
২০১৮ সালের ৫ই মার্চ আফরোজা দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। দোহার উপজেলায় তিনি প্রথম নারী কর্মকর্তা হিসেবে এই পদে যোগদান করেন। তার সৎভাব ও কর্ম দক্ষতায় পাল্টে গেছে উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সার্বিক চিত্র। উপজেলার প্রতিটি দফতরের কর্মকাণ্ডে ফিরে এসেছে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা। কমেছে জনভোগান্তি আর বৃদ্ধি পেয়েছে জনসেবার মান।
দোহারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় ১০ মাস এবং ধানমন্ডি রাজস্ব সার্কেলে ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
জানা যায়, তিনি দোহারে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে উপজেলার প্রশাসনিক চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। সকল কাজ সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান ও উপজেলার উন্নয়ন কর্মকান্ডে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছেন তিনি।

সর্ব ক্ষেত্রেই রয়েছে এই নারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদচারণা। দাফতরিক কাজের বাইরে সকাল-বিকাল ছুটে বেড়ান মাঠ-ঘাট। কথা বলেন উপজেলার সাধারণ মানুষের সাথে। শুনেন তাদের দু:খ কষ্টের কথা। খোঁজ খবর নেন সমাজের অবহেলিত গরীব দু:খী মানুষের। পরিদর্শন করেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্প। কোথাও কোনো সমস্যা দেখলে নেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
তাছাড়া গণমাধ্যম, ফেইসবুক, মুঠোফোন ও ই-মেইলের মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগ দ্রুত সমাধান ও তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিয়ে সব শ্রেণী পেশার মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। দরিদ্র জনসাধারণের জন্য বয়স্কা ভাতা কার্ড ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থায়নের ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন।
এছাড়া মুজিব বর্ষের ক্ষণ গণনা, ২১ ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা ও জাতীয় শোক দিবসসহ প্রতিটি সরকারি কর্মসূচি দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করে বেশ সুনাম অর্জন করেন এই চৌকস উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
দোহার উপজেলায় যোগদানের পর তিনি মেধাববৃত্তি, শেখ রাসেল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ড ফুটবল টূর্নামেন্ট চালু করেন। বাল্যবিয়ে বন্ধ, মেয়েদের যৌন নির্যাতন বন্ধ, মাদকসেবীদের ভ্রাম্যমাণ দন্ড-সহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে উপজেলাবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। তারই একান্ত প্রচেষ্টায় দোহারের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেয়েরা এবার জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে ইলিশ সংরক্ষণে নিয়মিত নদীতে টহল, জাটকা ইলিশ নিধন রোধ, জেলেদের বিভিন্ন দণ্ড ও মাছ শিকারী সিন্ডিকেট উৎখাতে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন অবকাঠামো ও শিল্পীদের নিয়ে নতুনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা।
তার উদ্যোগে দোহার ঘাটা এলাকায় ১২ দিনের শিশু তার মাকে ফিরে পায়। নদীভাঙন কবলিত পরিবারের পাশেও ছিলেন তিনি। আশ্রায়ণ প্রকল্পে নিয়মিত সহায়তা প্রদান, শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা পদক্ষেপেও তার ভূমিকা অপরিসীম। অনেক গৃহহীনকে গৃহ দেয়া। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়, কুসুমহাটি ইউনিয়নকে ভিক্ষুক মুক্ত করা, সেই সাথে সেখানকরা ভিক্ষুকদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাজ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজা আক্তার রিবা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন ও দোহারকে একটি আধুনিক উন্নত উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।
তিনি আরো বলেন, সরকারী কর্মকর্তারা জনগনের সেবক। নিজে কি পেলাম সেটা বড় কথা নয়, দেশ ও জাতীর জন্য কি করতে পারলাম সেটাই বড় কথা। নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সব সময় চেষ্টা করি মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘবের। আমি হয়েতো একদিন এই উপজেলায় থাকব না, কিন্তু থেকে যাবে আমার কর্ম। যদি ভাল কাজ করে যেতে পারি, তাহলে দোহারবাসী আমাকে আজীবন মনে রাখবে।
ইউএনও আফরোজা আক্তার রিবা’র জন্ম নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার গোতাশিয়া গ্রামে। তার বাবা মোঃ শহিদ উল্লাহ ভুঁইয়া ও মাতা লুৎফুন্নাহার। তিনি গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন।
শিক্ষা জীবনে তিনি নরসিংদীর হাড়িসাংগার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে এসএসসি, রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজ থেকে ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। পড়াশোনা শেষ করে ২৯তম বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন।


